১৯১০ সালে ইন্দুমাধব মল্লিক আবিষ্কৃত ইক-মিক কুকার ছিল ভারতের প্রথম স্টিম কুকার। একসাথে ভাত, ডাল ও সবজি রান্নার এই যন্ত্রের ইতিহাস ও কাজের পদ্ধতি জানুন।
১৯১০ সালে ইন্দুমাধব মল্লিক আবিষ্কৃত ইক-মিক কুকার ছিল ভারতের প্রথম স্টিম কুকার। একসাথে ভাত, ডাল ও সবজি রান্নার এই যন্ত্রের ইতিহাস ও কাজের পদ্ধতি জানুন।
🥘 ইক-মিক কুকার : ভারতের রান্নাঘরের বিস্মৃত বিপ্লব
ইক-মিক কুকার (Icmic Cooker) একসময় ভারতীয় বাড়ির রান্নাঘরে একটি পরিচিত নাম ছিল। আজকের প্রেশার কুকারের পূর্বসূরি হিসেবে এই যন্ত্রটি অনেকেই ভুলে গেছেন।
📌 ইক-মিক কুকার কী ছিল?
ইক-মিক কুকার ছিল এক ধরনের স্টিম কুকার বা বাষ্প রান্নার যন্ত্র, যেখানে ভাত, ডাল, সবজি, মাংস ইত্যাদি আলাদা পাত্রে ভরে একসাথে বাষ্পের মাধ্যমে রান্না করা হতো।
এটি টিফিন-ক্যারিয়ারের মতো পাত্রগুলোকে এক বড় সিলিন্ডারে সাজানো ও নিচে কয়লার আগুন জ্বালিয়ে রান্না করার মাধ্যমে কাজ করত। টিফিনের নিচে রাখা পানির বাষ্পই সমস্ত খাবার রান্না করত।
এর প্রধান সুবিধা ছিল:
✅ একসাথে পুরো খাবার রান্না করা
✅ খাবার পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই
✅ কম জ্বালানি ব্যবহার
✅ কোনো বিস্ফোরণের ভয় নেই (কারণ এটি চাপ-ভিত্তিক ছিল না)
👨🔬 🛠️ আবিষ্কারক: ইন্দুমাধব মল্লিক
ইক-মিক কুকারের ক্রীড়াপটের পেছনে ছিলেন বাঙালি প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব – ডক্টর ইন্দুমাধব মল্লিক।
📍 তিনি ছিলেন একজন পলিম্যাথ — অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, চিকিৎসক, লেখক ও উদ্ভাবক; তবে আজ তিনি প্রায় ভুলে যাওয়া এক নাম।
🔹 জন্ম: ৪ ডিসেম্বর ১৮৬৯
🔹 মৃত্যু: ৮ মে ১৯১৭
🔹 প্রধান আবিষ্কার: Icmic Cooker
🔹 আবিষ্কারের বছর: ১৯১০
তার সৃষ্ট Icmic Cooker কলকাতায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হতে শুরু করে এবং দ্রুত বাঙালি পরিবারগুলিতে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

🍲 ইক-মিক কুকারের কার্যপদ্ধতি
Icmic Cooker এর মূল গঠন ছিল:
🔸 এক রকম বড় সিলিন্ডার বা খোলস
🔸 তার মধ্যে একাধিক স্তরের টিফিন/বাটি
🔸 নিচে জলের পাত্র
🔸 নিচে জ্বালানি
এই যন্ত্রে জল বাষ্পিত হয়ে প্রতিটি স্তরের বাটিতে থেকে খাবার ধীরে ধীরে রাঁধে। ফলে:
✨ ভাত ও ডাল একসাথে প্রস্তুত
✨ অতিরিক্ত তাপ খাবারকে পুড়তে দেয় না
✨ স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর রান্না হয়
⚙️ কীভাবে কাজ করত ইক-মিক কুকার?
আগুন → জল গরম → বাষ্প তৈরি → উপরের বাটিগুলো গরম → খাবার সিদ্ধ
বাষ্প নির্ভর এই পদ্ধতি আজকের আধুনিক স্টিম কুকিংয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
🔁 ইক-মিক কুকার থেকে প্রেশার কুকারের যাত্রা
ইক-মিক কুকারের জনপ্রিয়তা কমে যায় প্রেশার কুকার বাজারে আসার পর। ১৯৫০-এর দশকে আধুনিক প্রেশার কুকারগুলো ভারতীয় বাজারে ঢোকে Hawkins ও Prestige সহ অন্যান্য ব্র্যান্ডের মাধ্যমে।
যদিও প্রেশার কুকার রান্না চাপ ও উচ্চ তাপমাত্রায় করে, ইক-মিক কুকার শুধু বাষ্পের মাধ্যমে ধীরে রান্না করে — ফলে বিস্ফোরণের কোনো ঝুঁকি থাকত না।
🔁 প্রেশার কুকারের সাথে পার্থক্য
| বিষয় | ইক-মিক কুকার | প্রেশার কুকার |
|---|---|---|
| তাপ পদ্ধতি | বাষ্প | উচ্চচাপ |
| নিরাপত্তা | খুব বেশি | তুলনামূলক ঝুঁকি |
| রান্নার সময় | ধীর | দ্রুত |
🏡 ইক-মিক কুকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
✔️ ইক-মিক কুকার ছিল ভারতীয় ঘরোয়া রান্নার প্রথম এক-পাত্র রান্নার যন্ত্র।
✔️ এটি আধুনিক প্রেশার কুকারের মতো জ্বালানি সাশ্রয়ী ও নিরাপদ রান্না শিক্ষা দিয়েছে।
✔️ ১৯১০-১৯৪০ সাল পর্যন্ত এটি বাংলা ঘরগুলোতে বিশেষ ভাবে ব্যবহৃত হত।
🧠 ইক-মিক কুকার শুধুই একটি রান্নার যন্ত্র নয় – এটি ভারতীয় উদ্ভাবনী শক্তির সাক্ষ্য
আজ ইক-মিক কুকার হয়তো ছড়িয়ে নেই রান্নাঘরে, কিন্তু এর মতো প্রযুক্তি আমাদের রান্নার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পদচিহ্ন রেখে গেছে। এটি শুধু একটি রান্নার যন্ত্র নয়, বরং ভারতের স্বদেশী উদ্ভাবনী মননের প্রতীক।

Leave a Reply